Seeam Ul Karim

আসসালামুওয়ালাইকুম ।   আমি সিয়াম উল করিম, আপনাদের সামনে কথা বলছি অটিজম সচেতনতা মূলক অনুষ্ঠান ‘উওরণ’ এ । আমার অটিজম আছে কিন্তু এটাকে আমার দুর্বলতা মনে করি না । আজকে আমি আপনাদের সামনে এসেছি  শেল্ফ অ্যাডভোকেট হিসেবে আমার নিজের কথা এবং আমার মতো যারা আছে, তাদের কথা বলার জন্য ।

আমার অটিজম আমি নিজে তৈরি করে নিইনি, কিন্তু এর ফলাফল আমাকে বহন করতে হচ্ছে কারন আপনারা  যারা আপনারা  যারা সমাজে আছেন তাদের গ্রহন যোগ্যতার দুর্বলতার কারনে । অনেকেই বলেন আমি তো অনেক ভাল, কথা বলতে পারি, নিজের কাজ নিজে করতে পারি, এক যাতায়াত করতে পারি, চাকুরী করছি । কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমার অটিজম ভাল হয়ে গিয়েছে ! মাস দুই আগে আমাকে বাংলাদেশ ক্লাব এর জিমনেসিয়াম থেকে বের করে দিয়েছে । কারন তারা আমাকে সাপোর্ট দিতে পারবে না…………. আসল কারন যে আমি এক কথা বার বার বলি, এটা সহ্য করার ইচ্ছে এবং মানসিকতা তাদের নেই ।

এই ধরনের সমস্যা আমি সব জায়গাতেই ফেস করি । অটিজমের ফিচার গুলি সারা জীবন ধরেই থাকবে, তাই আপনারা যারা আছেন, তাদের মানসিকতা এবং গ্রহণ যোগ্যতার কিছুটা পরিবর্তন করলেই আমাদের জীবন অন্য সবার মতো হয় ।

অনেক obstacle পার হয়ে আজ আপনাদের সামনে আমি দাঁড়াতে পেরেছি । একটি সময় ছিল যখন আমি কথা বলতে শিখলাম, তখন কি করে মনের ভাব প্রকাশ করে সেটি জানতাম না । আর তাই স্কুলে অন্য ছেলেরা যখন আমাকে নিয়ে টিজ করতো, টয়লেট এ ঢুকতে দিত না, আমার ব্যাগ, টিফিনবক্স নিয়ে ঝামেলা করতো, আমার বই খাতা উল্টাপাল্টা করে রাখতো, আমার অনেক রাগ হত, কষ্ট হতো কিন্তু বলতে পারতাম না । আমার স্কুলের টিচার আমাকে তিন মাস কম্পিউটার ক্লাসে ঢুকতে দেয়নি, দরজার সামনে দাড়িয়ে থাকতাম, কিন্তু জানতাম না মা’কে কি করে বলতে হবে । যখন ফেল করি, তারপর মা টিচার এর   সাথে ক্লাসে যাওয়ার ব্যবস্থা করে । এই রকম আরও অনেক ঘটনা আছে । যে বাবা মারা আমরা মত সন্তানদের স্কুলে দিতে চান, আমি বলতে চাই শুধু পড়াশোনা না, দেখার পেছনে আরও অনেক বিষয় আছে যেগুলিতে আপনারা না দেখলে আমাদের জন্য পড়াশোনা না, দেখার পেছনে আরও অনেক বিষয় আছে যেগুলিতে আপনারা না দেখলে আমাদের জন্য করা ডিফিকাল্ট হয় ।

আর স্কুলের বিষয়ে বলব যে আমার মা আমাকে নিয়ে ভর্তি করার জন্য ৩০ টার ওপরে স্কুলে ঘুরেছে, তারপর যে স্কুলে ভর্তি করতে পেরেছিল, সেখানেই আমাকে সীমাহীন ঝামেলা, অপমান এবং শিক্ষকদের অবহেলা সহ্য করে পড়াশোনা করতে হয়েছে । তাই আমি আমরা যারা সহপাঠী ছিল তাদের যারা সহপাঠী ছিল তাদের কাওকেই পছন্দ করি না আর কোন দিন দেখা করতে চাই না ।

আমার অটিজম আছে এটা আমি গ্রহন করে নিয়েছি, এই বিষয়ে আমিইণ্টারনেট থেকে পড়াশোনা করেছি । এছাড়া আমার এডিএইচডি, লার্নিং ডিসএবিলিটি, স্ট্রেস ডিজঅর্ডার, স্লিপিং ডিজঅর্ডার, অনেক সেন্সরি এবং মোটর স্কিল এ প্রবলেম, ডায়াবেটিকস, বেটাথেলাসেমিয়া আছে । Social Communication Difficulties আছে । কেউ মজা করলে বা হাসলে আমার ভালো লাগে না । অনেক রাগ করতাম । মানুষের  সাথে মিশতে সমস্যা হতো । তবে এখন ধীরেধীরে এটা ঠিক হচ্ছে । আমি এখন কথা যাতায়াত করতে পারি, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট যেমন রিক্সা ভাড়া করা, বাসে যাতয়াত, পাঠাও app ব্যাবহার করতে পারি । এখন আর মায়ের সাহায্য এতো বেশি লাগে না । ঘরের কাজ করা, একটু রান্না বান্না করা, কেনাকাটা করা পারি । ইনশালাহ আরো অনেক কাজ পারবো । আমি নিজে কে অনেক ইম্প্রুভ করতে চেষ্টা করছি । দোয়া করবেন যেন আরও পারি ।

আমার obstacle থাকার পরও আমি ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে এ,এস লেভেল পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি । পিএফডিএ- ভোকেশানাল ট্রেনিং সেন্টার থেকে লাইফ স্কিল, বেকারি এবং ফুড সার্ভিসেস উপর ট্রেনিং নিয়েছি । বর্তমানে বিমান বন্দরের ডিউটি ফি শপে চাকরি করি ।

ভবিষ্যতে আমি কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শিখতে চাই কিন্তু মা খোঁজ নিয়ে দেখেছেন যে আমাদের জন্য এই সুযোগ নাই । আমি অনুরোধ করছি যে আপনারা এই ট্রেনিং চালু করুণ, এটা হলে আমার মত অনেকের স্বপ্ন পুরন হবে ।

আমি ২রা এপ্রিল ২০১৯  বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে সফল ব্যক্তির সম্মাননা গ্রহন করি। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।

আমার মত অন্যরাও যে ধরনের সমস্যা ফেস করে, শুধু পড়াশোনার ক্ষেত্রে সমস্যা না, যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সমস্যা ফেস করে যেমন বাস রাস্তায় দাঁড়ায় না, একজন নামতে গিয়ে আরেকজন উঠে এবং সিএনজি বেশি ভাড়া নেয়, চিট করে, উল্টা পাল্টা কথা বলে এবং হাসে । বাসে বাসার জায়গা নেই, মানুষ মানুষ গায়ের ওপর চেপে বসে । সেটা আমাদেরকে জ্বালাতন করে ।

আমার অনুরোধ, আমাদেরকে মানুষ হিসেবে অন্য সবার মতো সম্মান করুন । আমার মা’র মতো আমিও হাল না ছেড়ে দিয়ে চেষ্টা করে গিয়েছি । আমাকে এই পর্যন্ত আসার জন্য আমার যে শিক্ষকরা হেল্প করেছেন, তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি । আমি এই বক্তৃতায় আমাদের মাইন্ডসেট পরিবর্তন, বাব মা এর দৃষ্টিভঙ্গি, স্কুলের এবং পড়াশোনা সমস্যা, এবং দৈনন্দিন জীবন যাপনে যে ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়, সেগুলির ছোটি একটি অংস আপনাদের সাথে শেয়ার করেছি । আপনাদের কাছে থেকে, সমাজ এবং সরকার থেকে আসা করছি যে আমাদের জন্য নিরাপদ এবং সম্মান নিয়ে বেচে থাকার ব্যবস্থা করে দিবেন । মানুষ হিসেবে সম্মান পাওয়া, অন্য সবার মত সমান সুযোগ পাওয়া আমাদের অধিকার ।

আপনাদের সবাইকে আবারও ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা ।

Leave a Reply