২০ শে ফেব্রুয়ারী ২০১৯, বহু প্রতিক্ষিত দিনটি ক্যালেন্ডারের নিয়ম মেনে চলে আসলো । আজ অফিস শেষ করেই রওনা হবো সবাই।তাইতো আজ সকালে রেডী হয়েই সবাই যার যার লাগেজ সহ  উপস্থিত হলাম অফিসে ।এবারের গন্তব্য সেন্টমার্টিন দ্বীপ ।চার দিন তিন রাতের ট্যুর।অনেকটা সেমিঅফিসিয়াল ট্যুর এটি । অফিসের কর্মকর্তা – কর্মচারী এবং তাদের ফ্যামিলি মেম্বারদের নিয়ে প্রতি বছর ট্যুরটি সম্পন্ন হয় । চেয়ারম্যান ম্যাডাম ভ্রমণে সবসময় কয়েকটি বিষয় খুব সতর্কভাবে খেয়াল রাখতে বলেন , যেমন- আরামদায়ক  জার্নি, আরামদায়ক থাকার ব্যাবস্থা,  স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও নিরাপত্তা । তিনটি কমিটির সমন্বয়ে প্রস্তুতিমূলক নানান কাজ বিশেষ করে  ট্যুর প্ল্যান করা, বাসের টিকেট সংগ্রহ, হোটেল রিসার্ভেশন, ট্রলার বুকিং, খাবারের আইটেম নির্ধারণ, চাঁদা সংগ্রহ হয়েই গিয়েছিলো বেশ আগেভাগেই। কিন্তু বাধ সাধলো জাহাজের টিকেট সংগ্রহ । বিভিন্নভাবে ট্রাই করেও জাহাজের টিকেট সংগ্রহ করা যাচ্ছিলনা। বেশ বেকায়দায় পড়ে গেলো নির্দিস্ট কমিটি। শেষমেশ ম্যানেজার স্যারের (জনাব কুতুব উদ্দিন স্যার)শরাণাপন্ন হওয়া । কথায় আছে-‘পুরানো চাল ভাতে বাড়ে। একেবারেই শেষমূহুর্তে স্যার ব্যবস্থা করলেন জাহাজের টিকেট তাও আবার ডিস্কাউন্ট সহকারে।

আর হ্যাঁ, ফেব্রুয়ারির মাসিক ‘Staff Wellbeing Activity’ তে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে এবার আমরা উপভোগ করেছিলাম বাংলা মুভি ‘দারুচিনি দ্বীপ’। বেশ মজা হয়েছিলো । কিন্তু কে ভেবেছিলো এই সিনেমার সাসপেনশন আমাদের ট্যুরের উপর ভর করবে ! সেন্টমার্টিন ট্যুর ছিলো শেষ পর্যন্ত চরম উত্তেজনাপূর্ণ! শেষ মুহুর্তে টেকনাফ পৌছানো ছিলো এক বলে ছয় মারার মতো! ওদিকে জাহাজ ছাড়ার সময় প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে আর এদিকে আমরা ভাবছি আজ  বুঝি আর জাহাজ  ধরা গেলো না। ম্যানেজার স্যার সহ আমরা কয়েকজন বিভিন্নভাবে জাহাজের ক্যাপ্টেনের সাথে যোগাযোগ করছি। যাহোক, জাহাজ আমাদের জন্য অতিরিক্ত কয়েক মিনিট অপেক্ষা করায় আমরা জাহাজ ধরতে পারলাম। অনেকটাই ভিআইপি মর্যাদা পেলাম জাহাজে উঠার সময় । জাহাজে ছিলো আমাদের  বসার জন্য  বিশেষ ব্যাবস্থা ।

২১ শে ফেব্রুয়ারী’১৯ সমুদ্রের সৌন্দর্য  আর জাহাজের পাশে পাশে উড়ে যাওয়া গাঙচিলের ডাক উপভোগ  করতে করতে  দুপুরের আগে আগে পৌছালাম সেন্টমার্টিন  দ্বীপে। উঠলাম হোটেলে। সবায় ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার সারলাম। খেলাম কয়েক পদের সামুদ্রিক মাছ। লাঞ্চের পর পরই আমাদের কেও কেও চলে গেলো মেইন বীচে সমুদ্রকে নিজেদের উপস্থিতি জানাতে, সমুদ্রের অস্তমান সূর্যকে বিদায় জানাতে । কেও কেও ঘুমিয়ে শরীরের ক্লান্তি দূর করলো হোটেলে। সন্ধ্যায় হলো  স্ট্রীট ফুড খাওয়া । রাতে রূপচাঁদা , চিংড়ী দিয়ে ডিনার শেষ করে চেয়ারম্যান ম্যাডামের নেতৃত্বে কেও কেও  বার্ণ করে নিলো তাদের ক্যালরি।

২২ শে ফেব্রুয়ারী’১৯  সুর্যকে স্বাগত জানাতে ভোর ৫ টায় সমুদ্র সৈকতে একত্রিত হলাম আমরা। চললো ফটোসেশন। ফিরে এসে সকালের নাস্তা সেরে সকলেই প্রস্তুত গন্তব্য ‘ছেঁড়া দ্বীপ’ – এর উদ্দেশ্যে যাবার জন্য । রিসার্ভ ট্রলারে সাগরের অপরুপ সৌন্দর্য আর ঢেউ তাল উপভোগ করতে করতে এবং গানের সুরে সুরে পৌছে গেলাম অপূর্ব সুন্দর ‘ছেঁড়া দ্বীপ’-এ। হলো বাংলাদেশের মানচিত্রের  দক্ষিণ দিকে ছেঁড়া দ্বীপের  পরে বাংলাদেশের আর কোনো ভূখন্ড নেই।প্রবাল পাথরে আচ্ছাদিত এই দ্বীপের  প্রবাল পাথর ছাড়াও উত্তাল তরঙ্গমালা সাজিয়ে তুলেছে এ ভূ-খণ্ডকে। কাছে যেতেই দেখা মিললো প্রবাল পাথর আর বালু যেন ঢেউ খেলছে ছেঁড়া দ্বীপে।

ছেঁড়া দ্বীপের চারপাশেই রয়েছে কেয়া গাছের বিস্তরণ। কেয়া গাছগুলোর মাথায়  ঝুলছে আনারসের মতো কমলা-হলুদ পাকা পাকা ফল। ছেঁড়া দ্বীপের সৌন্দর্যকে স্মৃতিতে রাখতে নিজেদেরকে সাগরের সাথে ছবির ফ্রেমে  বন্দী করলো সবাই। সমুদ্রে ঝাপাঝাপি করলো কেও কেও । সুস্বাদু ডাব খেলাম আমরা । মনের তৃপ্তি না মিটলেও নির্দিস্ট সময়ের মধ্যেই ফিরে আসতে হলো সেন্টমার্টিন  দ্বীপে। লাঞ্চ সেরে সন্ধ্যা অবধি চললো শপিং । নিজেদের জন্য, আপনজনের  জন্য ।

আজ রাতে আছে BBQ পার্টি। তাই আগ্রহের কমতি নেই কারোর, ক্লান্তি যেনো হারিয়ে গেছে। রাতে মজার মজার আইটেমের সাথে আছে রূপচাঁদা ফ্রাই। জমে উঠলো  BBQ পার্টি। খাবারে সুবাস যেনো ক্ষিধেকে আরো জাগিয়ে তুলছিলো । হোটেলের আঙ্গিনায় চলছে BBQ পার্টি। সবাই সুন্দর সাজে উপস্থিত। ‘ছেঁড়া দ্বীপ’ – এর অভিজ্ঞতা শেয়ার  করছিলো কেউ কেউ ।  আকাশের নীচে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার জমে উঠতে দেরী হলো না। খেলাম মজাদার সব খাবার । খাবার শেষে খোশগল্প চলছিলো, চলছিলো ভূতের গল্প । আবার শেষ বারের মত সেন্টমার্টিনের সূর্যদোয় উপভোগ করার আগ্রহও আছে সবার । অবশেষে তাই  ঘুমাতে যাবার পালা।

২৩ শে ফেব্রুয়ারী’১৯ । সকালের নাস্তা সেরে সকলেরই লাগেজ গুছানোর চেস্টা । আবার  লাঞ্চের পরপরই জাহাজ ঘাটে যাওয়ার একটা তাগিদ আছে সবার ভিতর। তাইতো শেষ সুযোগে আরেকবার শপিং করলাম যে যার মত। কেও কেও হোটেলের বারান্দায় কিছুটা অলস সময় কাটালাম। সময় মত জাহাজে উঠলাম আমরা । আবার সেই ভিআইপি ব্যাবস্থা। ছোটো- বড় সকলে মিলেই আনন্দঘন সময় কাটালাম জাহাজের উপর । ছবির ফ্রেমে আটকে রাখলাম স্মৃতিগুলোকে। আমাদের সাথে সাথে পুরো পথ  উড়ে সংগ দিলো  গাংচিল যা ভ্রমনে আলাদা মাত্রা যোগ করলো। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতির ফলে  জাহাজ থেকে নামতে বেশ বেগ পেতে হলো সকলকে। জাহাজ সময়ের থেকে দেরীতে পৌঁছালেও বাস ধরার টেনশন ছিলো না আমাদের । কেননা প্রায় পুরো বাসটায় ছিলো আমাদের বুকিং। অবশেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাস ভ্রমণ। রাতে স্টপেজে ক্ষিধে নিবারণ এবং বাসে  ঘুমাতে ঘুমাতে ২৪ শে ফেব্রুয়ারী’১৯  সকাল ৮ টায় সকলের সুস্থ্যভাবে সায়েদাবাদ পৌঁছানো।

সেন্টমার্টিন যাবার সময় সকলেই গেয়েছিলো সেই গানটি-

‘ মন চায় মন চায় যেখানে চোখ যায় সেখানে যাবো হারিয়ে…দুঃখটাকে দিলাম ছুটি… মনটা যেন আজ পাখির ডানা হারিয়ে যেতে তাই নেই তো মানা’।

ঢাকায় ফিরে দুঃখ নয় তবে ক্লান্তিকে ছুটি দিয়ে সবাই আবার আমরা অফিসের  কাজে মনোনিবেশ করলাম ঐ দিনেই। হারিয়ে গেলাম নিজেদের কাজের ভূবনে। সকলের মন মাঝারে দীর্ঘ দিন এই স্মৃতি থাকবে অমলিন ।

Leave a Reply